বাদামের অসাধারন পুষ্টিগুণ

img-responsive

সকল প্রকার খাবারের মধ্যে বাদাম অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার। পুষ্টির সাথে সাথে এটি অত্যন্ত সুস্বাদুও। বাদাম  নিয়মিত
খেলে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমে যায়। গবেষণায় জানা গেছে এই বাদাম খাওয়ার ফলে অনেক রোগ মুক্তির সাথে সাথে ব্রেনে পুষ্টি জোগায়, যার ফলে যেসকল মানুষ মনে রাখতে পারে না। তাদের মনে রাখতে  সাহায্য করে। বাদামে প্রচুর আঁশ ও পুষ্টিকর উপাদান রয়েছে। এর মধ্যে হৃৎপিণ্ডের জন্য উপকারী উপাদানও রয়েছে। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, দৈনিক ১০ গ্রাম করে বাদাম গ্রহণ করলে মৃত্যুর জন্য দায়ী কয়েকটি বড় ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। বাদামের পুষ্টিগুণ দেওয়া হলো চলুন জেনে নেই।

চিনাবাদাম

বাদাম আমাদের খুবই পছন্দের খাবার। আর এই বাদামের মধ্যে রয়েছে হাজারো গুনাগুন। চিনাবাদামে আছে প্রোটিন, ফাইবার, ক্যালসিয়াম, আয়রন, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ভিটামিন-এ, বি, সি। আর এই ভিটামিন আমাদের দেহের জন্য অত্যন্ত উপকার।

উপকারিতা

* প্রোটিনের সম্পূর্ণ উৎস। ভোরবেলা খালি পেটে বাদাম খেলে এনার্জি পাওয়া যায়।
* নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে বাদাম খেলে হার্ট ভালো থাকে।
* রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

আখরোট

আখরোট বাদাম আমাদের দেশে পাওয়া যায় কম। এই বাদামটি দেহের হাড় মজবুত করতে সাহায্য করে। এর মধ্যে ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাসিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড ভিটামিন বিদ্যমান।

উপকারিতা

* হাড় শক্ত করে।
* ব্রেনে পুষ্টি জোগায়।

পেস্তা বাদাম

পেস্তাবাদাম রান্নার কাজে বেশি ব্যবহার করা হয়। খাবারের মধ্যে দিলে খাবার মজাদার হয়। এছাড়া রক্ত শুদ্ধ করতে অনেক কাজ করে। এতে আছে ফসফরাস, পটাসিয়াম, সোডিয়াম, কপার, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন।

উপকারিতা

* রক্ত শুদ্ধ করে।
* লিভার ও কিডনি ভালো রাখে।

কাজু বাদাম

কাজু বাদাম খেতে অনেক মুখরোচক হয়। কাজু বাদামের মধ্যে আছে আয়রন, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম। আরও আছে ভিটামিন-এ যার ফলে অ্যানিমিয়া ভালো হয়, ত্বক উজ্জ্বল করেতেও সাহায্য করে।  রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও সাহায্য করে থাকে। কিডনি বা শিমের বীচির আকৃতির কাজু বাদামের প্রচুর স্বাস্থ্য উপকারিতা আছে অনেক। আজ সেই উপকারিতাগুলো সম্পর্কেই জেনে নেই চলুন।

১। হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখে

কাজু বাদামে ভালো ফ্যাট থাকে এবং এতে কোন কোলেস্টেরল থাকেনা। খারাপ কোলেস্টেরল এলডিএল এর মাত্রা কমাতে সাহায্য করে কাজু বাদাম। অনেকেই মনে করে থাকে চর্বি গ্রহণ বাদ দেয়াটা শরীরের জন্য ভালো, কিন্তু এই কথাটি আসলে সত্যি নয়। সুস্থ দেহের জন্য খাদ্যের সকল ধরণের গুরুপ থেকেই এমনকি ফ্যাট থেকেও পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন। ভালো উৎস থেকে তা গ্রহণ করতে হবে যেমন- কাজু বাদাম। তাছাড়া কাজুতে অলেইক এসিড থাকে যা হার্টের জন্য অনেক উপকারি।

২। শক্তিশালী হতে সাহায্য করে

কাজু বাদাম ম্যাগনেসিয়ামে সমৃদ্ধ যা শক্ত হাড়ের জন্য, মাংসপেশী ও স্নায়ুর সঠিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয়। আমাদের শরীরে দৈনিক ৩০০-৭৫০ গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম প্রয়োজন হাড়ের মধ্যে ক্যালসিয়াম শোষণের জন্য। আর কাজুবাদামে ম্যাগনেসিয়াম ভরপুর থাকে। তাই বেশি করে কাজুবাদাম খাওয়া উচিত।

৩। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে

কাজুবাদামে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বিদ্যমান থাকে। সাথে পটাসিয়াম প্রচুর থাকে। কিন্তু এই বাদামটিতে  সোডিয়াম কম থাকে। পটাসিয়াম বেশি থাকাই রক্তচাপ নিয়ন্তনে অনেক সাহায্য করে । যার ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাইলে প্রচুর কাজুবাদাম খাওয়ার প্রয়োজন।

৪। ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়

কাজু বাদামে সেলেনিয়াম থাকে এবং ভিটামিন ই থাকে। যা ফ্রি যাডিকেলের জারণ প্রতিরোধ করে। যার ফলে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। কাজুতে প্রচুর জিংক থাকে বলে ইনফেকশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেও সাহায্য করে থাকে।

৫। শরীরের বিভিন্ন কাজের প্রধান ভূমিকা পালন করে

কাজুবাদামে আরো থাকে উচ্চমাএায় কপার। তাই যেহেতু কাজুতে উচ্চমাত্রার কপার থাকে তাই এনজাইমের কাজে, হরমোনের উৎপাদনে এবং মস্তিস্কের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও লাল রক্ত কণিকার উৎপাদনেও সাহায্য করে বলে অ্যানেমিয়া প্রতিরোধে সহায়তা করে।
যেহেতু কাজুতে উচ্চমাত্রার ক্যালোরি থাকে তাই দৈনিক ৫-১০ টা কাজু বাদাম খাওয়াই যথেষ্ট। যাদের অ্যালার্জির সমস্যা আছে এবং মাইগ্রেনের সমস্যা হয় যাদের তাদের না খাওয়াই ভালো। বিভিন্ন ধরণের কাজু বাদাম পাওয়া যায় যেমন- লবণাক্ত, সিদ্ধ বা মশলাযুক্ত। হাইপারটেনশনের রোগীদের সল্টেড কাজু না খাওয়া ভালো।

কাঠ বাদাম

কাঠবাদাম অত্যন্ত পরিচিত ও সস্তা ফল। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘বি’, ‘ই’, ‘ডি’ এবং উপকারী ফ্যাট। গুণাগুণ দিক থেকে বিবেচনা করে দেখলে এটিকে বলা হয় সুপার ফুড। কাঠবাদামের ভিটামিন ‘বি’ মস্তিষ্কের কোষ উন্নত এবং স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে থাকে। প্রতিদিন কাঠবাদাম খেলে বাচ্চাদের স্মৃতিশক্তি অনেক বেশি প্রখর হবে। পানিতে ভিজিয়ে কাঠ বাদাম খোসা ছুলে খেতে হবে। তবে অবশ্যই এটি তেলে ভাজা ও লবণমুক্ত হতে হবে। এর ফাইটোস্টেরল ও মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড ক্ষতিকর কোলেস্টরেল কমাতে সাহায্য করে। কাঁচা কাঠবাদাম প্রোটিন এবং ফাইবার ক্ষুধা কমাতেও সাহায্য করে। এর ফলে সহজে দেহের ওজন কমে। এছাড়া কাঠবাদামে থাকা উপাদান শরীরকে চর্বি শোষণ করতে দেয় না। এর ফলে এ চর্বি বের হয়ে যায়। কাঠবাদামের ভিটামিন ‘ডি’ ও ম্যাগনেসিয়াম চুল পড়া রোধ এবং মাথার ত্বক উন্নত করতে সাহায্য করে। এর ভিটামিন ‘ই’ ত্বকের রুক্ষতা-শুষ্কতা দূর করতে বেশ উপকারী। কাঠবাদামের রস ব্যবহার করলে ত্বক মসৃণ, সুন্দর ও উজ্জ্বল হয়।

স্মৃতিশক্তি প্রখর করে কাঠবাদাম

কাঠবাদামে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি। যা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে উন্নত করতে সহায়তা করে এবং স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকেই প্রতিদিন কাঠবাদাম খাওয়ার অভ্যাস করলে স্মৃতিশক্তি অনেক বেশি প্রখর হয়। তবে অবশ্যই তেলেভাজা লবণাক্ত বাদাম খাওয়া উচিৎ নয়। পানিতে ভিজিয়ে ছিলে খেতে হবে।

দ্রুত ওজন কমাতে কাঠবাদাম

কাঠবাদামে রয়েছে ফাইটোস্টেরল এবং মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড যা দেহের ক্ষতিকর কোলেস্টরল কমাতে সাহায্য করে। কাঁচা কাঠবাদাম প্রোটিন এবং ফাইবারের উৎস যা অনেক সময় ধরে ক্ষুধার উদ্রেক করে না। এবং ক্ষুধা কম থাকে। এতে করে দেহের ওজন কমতে সাহায্য করে।

চুলের যত্নে কাঠবাদাম তেল

চুল পড়া, চুলের রুক্ষতা এবং মাথার ত্বকের সুস্থতায় কাঠবাদামের তেলের জুড়ি নেই। কাঠবাদামের ভিটামিন ডি ও ম্যাগনেসিয়াম চুল পড়া রোধ করে এবং মাথার ত্বক উন্নত করে। চুলে সরাসরি এই তেল লাগিয়ে ঘন্টাখানেক রেখে চুল ধুয়ে ফেলতে হবে।

ত্বকের সুস্থতায় কাঠবাদামের দুধ

কাঠবাদামের ভিটামিন ই ত্বকের রুক্ষতা ও শুষ্কতা দূর করতে বেশ কার্যকরী। ত্বকের জন্য প্রাকৃতিক ময়েসচারাইজার হিসেবে কাজ করে কাঠবাদামের দুধ। কাঠবাদাম বেটে নিয়ে চিপে এর দুধ বের করা যায় সহজেই। এই দুধ সরাসরি ত্বকে ব্যবহার করলে ত্বক মসৃণ, সুন্দর ও উজ্জ্বল হয়।

আরো কিছু কাঠ বাদামের গুনাগুন

১. কাঠবাদামের মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট, প্রোটিন ও পটাশিয়াম হার্ট ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২. কাঠবাদামের ভিটামিন ই হার্টের নানারকম রোগ হবার আশঙ্কা দূরে রাখে। কাঠবাদামে উপস্থিত ম্যাগনেসিয়াম হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করে এবং পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
৩. কাঠবাদামে রয়েছে বিশেষ ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ‘ফ্ল্যাভোনয়েড’, যা বিভিন্ন ধরনের অসুখ প্রতিরোধে খুবই কার্যকর। কাঠবাদাম কয়েক ধরনের ক্যানসার প্রতিরোধেও সহায়তা করে।
৪. কাঠবাদামে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি। ভিটামিন বি মস্তিষ্কের কোষগুলোকে উন্নত করতে সহায়তা করে এবং স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকেই প্রতিদিন কাঠবাদাম খাওয়ার অভ্যাস করলে স্মৃতিশক্তি প্রখর হয়।
৫. কাঠবাদামে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আঁশ, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।
৬. মোনোপেজের পর নারীদের নিয়মিত কাঠবাদাম খাওয়া উচিত। কারণ এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম যা মোনোপেজকালীন সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে।
৭. কাঁচা কাঠবাদাম প্রোটিন এবং ফাইবারের উৎস যা ক্ষুধা কমায়। এতে করে ওজন কমতে সাহায্য করে।
৮. চুল পড়া, চুলের রুক্ষতা এবং মাথার ত্বকের সুস্থতায় কাঠবাদামের তেলের জুড়ি নেই। কাঠবাদামের ভিটামিন ডি ও ম্যাগনেসিয়াম চুল পড়া রোধ করে এবং মাথার ত্বক উন্নত করে। চুলে সরাসরি এই তেল লাগিয়ে ঘন্টাখানেক রেখে চুল ধুয়ে ফেলুন।
৯. কাঠবাদামের গুঁড়ো খুব ভালো স্ক্রাবার হিসেবে কাজ করে। কাঠবাদাম বেটে তার সঙ্গে মধু মিশিয়ে ত্বকে লাগালে ত্বক হয়ে ওঠে উজ্জ্বল ও কোমল।

আমন্ড

বাদামের রাজা আমন্ড। এই বাদামের অনেক গুন। এইকারনে এই বাদামকে বাদামের রাজা বলা হয়। ক্যালসিয়াম, ফাইবার, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ফলিক এসিড ও ভিটামিন ই।

উপকারিতা

* শ্বাসকষ্ট, কোষ্ঠকাঠিন্য ও ত্বকের নানা সমস্যায় খুব ভালো। সব বাদামের মধ্যে আমন্ডে বেশি পরিমাণে ক্যালসিয়াম আছে।
* নিয়মিত চার-পাঁচটি আমন্ড খেলে এলডিএল কোলেস্টেরল বা ব্যাড কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে যায়। ফলে হৃদরোগের আশঙ্কা থাকে না।
* কোলন ক্যান্সারের আশঙ্কা কমে।
* অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আছে। কেমোথেরাপি চলাকালে আমন্ড মিল্ক খেলে ইমিউনিটি সিস্টেমের উন্নতি ঘটে।
* আমন্ডের ফাইবার শরীরে কার্বোহাইড্রেট শোষণের গতি কমায়। ফলে ডায়াবেটিসের জন্য উপকারী।
* আমন্ড বাটা নিয়মিত লাগালে বলিরেখার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

বাদামের অপকারিতা

বাদামের মধ্যে নানান পুষ্টিগুণ ও বিভিন্ন রোগের মুক্তির ভিটামিন পাওয়া যায়। এতে তেমন কোন ক্ষতিকর উপাদান কনিকা নেই কিন্তু বেশি খেলে অনেক সময় মাথা হালকা ব্যথা করতে পারে। তাই নিয়মিত খাবেন। কিন্তু পরিমিত খেতে হবে। তাছাড়া বাদামে প্রচুর ভিটামিন বিদ্যমান থাকে।

No comments:

Post a Comment